Sunday, 24 August 2014

Womaniya....

They stood on the terrace, their bodies entwined in each other’s. Their clothes hung helplessly from their bodies like office goers would from Bus No.42B every morning on their way to work. His nose buried itself in the smoothness of her skin and tresses. Her right ear was almost in his mouth and words poured incessantly into it, making her heart melt like a Marie biscuit, dipped in a cup of hot tea. It was perfect. They were perfect.

The conversation continued. He talked. (With her heart in her mouth, she chose not to take the chance). While looking beyond the terrace, he whispered, “If there’s any woman who comes close to her in terms of beauty, inner or otherwise, it would be you.”


So, she was the second most beautiful woman in his life. Virgo women! They had their ways.  (With a Sagittarian’s wicked sense of humour, abundant use of sarcasm, acute absence of poise and compulsive clumsiness, what better results did she expect?)

“Just look at her! You agree?” 
   
She looked at her. And, a part of her changed that day. She didn’t feel jealous for the first time in her life when he praised another woman so blatantly!

She pulled his mouth in hers and whispered, “I do.”
********************************



Happy Birthday, Kolkata. You are indeed the most gorgeous woman on this planet. 
***********************************

Monday, 21 July 2014

নদীর ওপার


“শেষ দিনটা কেমন ছিল পুরনো অফিসে?” – প্রশ্নের মধ্যে লুকনো ‘চুপ করে কেন, একি বেলা! তুমি কাঁদছ?’

চোখ পিটপিট করলাম, ওপর দিকে তাকালাম, জলের বোতলে ঢক ঢক করনে লাগা। কিন্তু চোখের জল আর দরদ দুটোই উথলে নদী আপন বেগে পাগল পারা। “সাধে বলি, তোর favourite হলিডে স্পট নদীর ওপার? খবরদার মন খারাপ করবি না।”

মন খারাপের সুইচ বোর্ডটার কাছে বেশির ভাগ সময়ই আমার বয়েস পাঁচ। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে লম্বা হওয়ার চেষ্টা, তবুও সুইচে হাত পৌঁছয় না। শেষে রুলার বা হাত-পাখার পেছন দিকটা দিয়ে আলো জ্বালানো।

মন খারাপ হল ছোট বেলার সুইচ বোর্ড। ইচ্ছে মত কি আর বন্ধ করা যায়?

**********

বাবা ভাবতো ফক্স অ্যান্ড মণ্ডল থেকেই বোধহয় আমি রিটায়ার করব। এত ভাল জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়া আর রেল লাইনে গলা দেওয়া....এই দুটোর মধ্যে দ্বিতীয়টা ঢের ভাল। বাবাকে খুব খুব অবাক করে আমি পুরনো অফিস ছেড়ে দিলাম একদিন।

আজকালকার দিনে চাকরি ছাড়া কোন বড় ব্যাপার নয়। এরম লোক চিনি যারা বছরে দুবার চাকরি বদল করেছে। এই যুগে তাদের পাশে আমি আলিপুর চিড়িয়াখানার “অদ্বৈত”। সেই জন্যেই গলা ভার আর চাপা আনন্দ। আর বেশ খানিকটা আদেখলামি। (নতুন অফিস যাব বলে আমার মেসো-শ্বশুর নতুন জামা কিনে দিয়েছেন, বাবারা ব্যাগ আর পেন। এমনি এমনি শেষের শব্দটা লিখিনি!)

*******************

এক মাসের বেশিই হয়ে গেছে ওই পাড়া, ওই অফিস ছেড়েছি আমি। তবুও, এখনও, বিয়ের ঠিক পর পর গড়িয়াহাট থেকে অটোয় ফেরার দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। নিউ আলিপুরে পৌঁছে অটোওয়ালা বলতেন, “আপনার স্টপেজ এসে গেছে, দিদি।” আমার সম্বিত ফিরত। বলতাম, “না বেহালায় যাব তো!” উত্তরে শুনতাম, আমি নাকি অটোয় ওঠার সময় নিউ আলিপুর বলেছি।

এই ভুল যে কতদিন করেছি মনে নেই। যখন লজ্জা করত, মাকে মনে পড়তো। মা এখনও মাঝে মাঝে আমার বাপের বাড়ি আসা প্রসঙ্গে বলে, “ফুলবাগানে কখন আসবি?” কিছু অভ্যেস বিছানার চাদরে নেল পালিশের দাগ। উঠতেই চায় না।

আমি এখনও মাঝে মাঝে “আমাদের অফিস” বলে পুরনো অফিসটাকে বোঝাই। আর তখন নতুন কলিগদের সামনে কি পরিমাণ অপ্রস্তুত হই কি বলবো! এই ভুলে এত বার জিভ কেটেছি, যে কালি ঠাকুর কম্পিটিশনে নামলে, খুব বাজে ভাবে হেরে মনোজ কুমারের মতো মুখ লুকোতেন।
আসলে অভ্যেস। বদ অভ্যেসও বলা যেতে পারে।

*************

নতুন চাকরি পাওয়ার আনন্দ খানিকটা হয়েছে সেটা সত্যি। টাকা পয়সা মন্দ না, কর্তার অফিস থেকে ঢিল ডিউস বল-ছোঁড়া দূরত্ব, শনিবার ছুটি। অনেকগুলো নারকোলের পুর-ভরা পাটিসাপটার মধ্যে হঠাৎ একটা ক্ষীরের। ভাল খারাপ জানি না। স্বাদ বদল তো বটেই।

নতুন অফিসের প্রথম সপ্তাহের শেষে, ও জিজ্ঞেস করলো, “কেমন লাগছে তোর নতুন অফিস?”
-      
   -অন্যরকম।

“কিরকম অন্যরকম শুনি” ...
-     
   - প্রথম যেদিন ঝালমুড়ি আনালাম, খুব অস্বস্তি হল। হাই কোর্ট পাড়ার মুড়ি মানেই cause list-এর পাতা দিয়ে বানানো ঠোঙা। সেটায় চোখ সোয়ে গেছে। অন্য প্রিন্টের পাতা দেখে কিরম অদ্ভুত লাগছিল!












“এটাতেও খাওয়া টেনে আনলি? আর?”
-    
-      - এখানে মাটির ভাঁড়ে চা পাওয়া যায়না। CCD-র মেশিন আছে। চা ভাল। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুলতানি আর চা শেষ হয়ে গেলে ভাঁড়ের ধারগুলোয় দাঁত বসানোটা নেই।












“আর?”  

-     -  কুকি জার, ফ্রেঞ্চ লোফ আছে। কিন্তু Bakery বিস্কুট আর বাপুজি কেক নেই।

“পুরো নদীর-ওপার syndrome রে। নেই নেই করে গলা শুকনো! পেটুক কোথাকার! কি আছে সেটা বল?”

-      - ক্ষেতে ফসল আছে, গাছে ফুল আছে, ফল আছে, পাখি আছে...শান্তি আছে, সুখ আছে। *চিন্ময় রায়ের মতো করে*

এর পর আর কথা এগোয় না। এক রাশ হাসি দমকা হওয়ার মতো এসে কথার মাঝখানে ঢুকে পড়ে আর সব এলোমেলো করে দেয়।

****************








ফুল আছে, ফল আছে বলতে মনে পড়ল। এই অফিস শুরু হয় দেরীতে। কর্তাকে অফিস পৌঁছে আমার দু’হাত ভরতি সময় থাকে। ওই সময়টা আমার নিজের। একদম নিজের। মেট্রোরেল-জীবনে কিছুক্ষণের জন্য ট্রাম কোম্পানির সুখ। বই পড়ি, হেঁটে চারিদিক ঘুরে বেড়াই, ছবি তুলি, কোন নতুন কাফে চোখে পড়লে গলা ভিজিয়ে আসি, বেল ভিউএর লেকটার ধারে বসে মাছ আর মানুষ দেখি অপলক। এর মধ্যে সবথেকে আনন্দের জিনিসটা হল নানান গাছপালা আর ফুল চেনা। গাছ দেখলেই আমার এই বাড়ির বাবার কথা মনে হয়। বাজার থেকে বাবা ফিরেছে; আমার কৌতূহলঃ ‘কি কিনে আনলে?’ উত্তরঃ ‘মায়ের হরলিক্স, মুড়ি আর দুটো গাছ।’ এক রাশ অক্সিজেন ভরা একটা উত্তর।








আর একজনের কথাও মনে পড়ে। আমার এক দিদি। শিলিগুড়িতে থাকে। খুব গাছ ভালবাসে। বেশির ভাগ ছবিই তার জন্য তোলা। এরম একদিন ছবি তুলতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়লো কদম গাছ। খুব একটা দেখি না তো আজকাল, তাই অদ্ভুত আনন্দ হল। উপরি পাওনাঃ মাটিতে দুটো ফুল পড়েছিল। হাতে নিয়েই ভাইয়ের কথা মনে হল। ছোটবেলায়, স্কুলে পড়তে মা ওকে কতবার এভাবে চুল কাটিয়ে দিয়েছে!













আমার অফিসে ঢোকার মুখে এই গাছটা আছে। কাঠগোলাপ এমনিতে ডিমের পোচ। সাদা-হলুদ। কিন্তু এটা ক্যান্ডিফ্লস। বুড়িমার মিষ্টি চুলের মতো মন ভাল করা গোলাপি আভা।

পূর্ণেন্দু পত্রির একটা কবিতা পড়েছিলাম। সেটা খানিক এরমঃ
“তবে কলকাতার এখন ডায়াবেটিস।
কলকাতার ইউরিনে এখন বিরানব্বই পার্সেনট সুগার।
কলকাতার গলব্লাডারে ডাঁই ডাঁই পাথর।
গাছপালা খেয়ে আগের মতো হজম করতে পারেনা বলে
কলকাতা এখন মানুষ খায়...।”

সত্যি হয়তো গাছপালা খেলে গুরুপাক হয় শহরের। কারণ, আমার যাওয়া-আসার পথে এখনও প্রচুর সবুজ দেখতে পাই।

আগের অফিসের দুদিক দিয়ে শুধুই বাড়ি। গাছ বলতে, পুরনো বাড়ির ইটের পাঁজর ফুঁড়ে সবুজ বিপ্লব। এখানে একটা বড় জানলা আছে। অনেকখানি আকাশ আর অনেকখানি সবুজ দেখা যায় জানলার পাশে দাঁড়ালে।




আর ছাদে উঠলে দেখা যায় ফ্লাই ওভার।




*******************

নতুন কাজের জায়গা নিয়ে নানান বলছি যখন, তখন এটা না বললেই নয়। এই প্রফেশন আমার কাছে খানিকটা prostitution এর মতো। মাইনে নেব, কাজ করব। সোজা হিসেব। প্যাশন নেই। “A woman can fake orgasms”– এর নিয়ম মেনে, ভাল কাজ হলে, বড় ডিল সাইন হলে খুশিও হবো। এই ল ফার্মটি যদি জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেয়, কলারটা কান অবধি তুলে, শিষ দিতে দিতে বাড়ি ফিরবো। কিন্তু ওইটুকুই। কাজে ঝাঁপ দিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পার হবো, এরম ইচ্ছে বা আগ্রহ কোনটাই আমার নেই। তাই কাজের থেকে কাজের জায়গায় লোকজন কেমন, পরিবেশ কেমন সেটা নিয়ে আমার আগ্রহ অনেক বেশি।

এই অফিসে লোকজন দারুণ এটা বলার সময় হয়তো আসেনি। কিন্তু একটা ঘটনা না বললে অন্যায় হবে।

হাই কোর্ট পাড়ায় কত ভালো খাবার পাওয়া যায়...এই গল্প ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো আমি বাজাতাম প্রথম ক’দিন। দ্বিতীয় সপ্তাহে এক সহকর্মী আমায় cause list দিয়ে বানানো একটা ঠোঙ্গা দিল। তাতে টেম্পল চেম্বারের (আমরা বলতাম ছ’নম্বর) শিঙ্গাড়া! খয়েরি পুরে ঠাসা ‘হিন্দুস্তানি দোকানের’ শিঙ্গাড়া। কেউ এত কম আলাপে, মনে রেখে এটা করতে পারে, আমি সত্যিই ভাবিনি। “Kya kahoon mein apse doston…meri toh aankh bhhar ayi hein *Satyameva Jayate-তে আমির খানের মতো গলা করে*

*******************

এটা বলতে গিয়ে মন আবার ফ্ল্যাশ ব্যাক মোডে। আগের অফিসের এক দাদা মিটিং ফেরত নাহুমসের দেড় টাকা দামের মটন শিঙ্গাড়া আনত আমাদের জন্য। সঙ্গে ব্রাউনি। রামজানের সময় আলিয়া থেকে হালিম!

আর একজন অফিসের কাজে দিল্লি গেলেই, রাশি রাশি শাওয়ার জেল, শ্যাম্পু আর লোশন।
পাঁচ তারা হোটেলের এই শাওয়ার জেলগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য আছে। সাবান গায়ে মাখার পর জল দিয়ে ধুলে খুব সহজে চলে যায়। কিন্তু এগুলো অনেক ধোওয়ার পরও কেমন যেন গায়ে লেগে থাকে।

ঋতুপর্ণ ঘোষের একটা লেখায় উনি বলেছিলেন, যে লেসার অপারেসানে চোখের দৃষ্টি সংশোধন করানোর পর উনি আর চশমা পরতেন না। প্রথম প্রথম মনে হত যেন জামা কাপড় না পড়ে বাড়ি থেকে বেরছেন। চশমায় এতটাই অভ্যস্ত উনি। নানান মুহূর্তে অতর্কিতে ওঁর হাত চলে যেত চশমার জায়গায়। তাই শেষে উনি লিখলেন...

“আমি এখনও চশমা পরি।
মনে মনে।”
  
বিয়ের পর বাঁ হাতে লোহা পরতাম বলে, ঘড়িটার হাত বদল হল। বহুদিন অবধি সময় দেখতে গেলে বাঁ হাতটা উঠে আসতো।

এটা বোধহয় স্বাভাবিক। ঘড়ি, চশমা ছাড়াও আর অনেক ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এমনকি কাজের জায়গাতেও। 

Sunday, 1 June 2014

চ্যাপ্টা গোলাপ

ভোরের হাওয়া গায়ে লাগতেই আয়নাটা আড়মোড়া ভাঙল দেওয়াল জুড়ে। সকাল হয়েছে। বাড়িতে ও সব থেকে বড় আয়না বলে ওর থাকা-শোওয়ার জায়গাটা সবার চাইতে বড়।

বাড়ির বড় বউ সকাল সকাল স্নান সেরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালেন। গায়ে লাল শাড়ি, মাথার এক ঢাল কোঁকড়া চুল পরিপাটি করে আঁচড়ে নিলেন; চিরুনির একটা দিক সিঁদুরে ডুবিয়ে সিঁথিটা লাল সুরকির রাস্তা। লালের পরেই, গিন্নিমার প্রিয় রঙ সাদা। গলায় কানে মুক্ত, হাতে শাঁখা, খোপার কাঁটা আর জালেও সাদা পাথরের ঝিকিমিকি। আয়নার কিন্তু সব চাইতে ভাল লাগে গিন্নিমার গলার ওই দুটো লকেট...প্রথমটা ঠিক যেন ব্রিটানিকার ছোট একটা মূর্তি (কাছ থেকে সে দেখেছে লকেটের তলায় লেখা মিনারভা’); আর একটা হল, তিনটে সিংহের মুখ খোদাই করা লকেটটা। গলায় পরলে, রানির মত দেখায় বউমাকে।

সারাদিনের এক সমুদ্র কাজ বাকি। তার ঢেউয়ের শব্দে বড় বউয়ের সম্বিত ফিরল। কাজের মানুষটার কি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সময় কাটালে চলবে? যখন বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে আসেন বহু বছর আগে, তখন এত দায়িত্ব ছিল না। এক বিদেশি কোম্পানির জুনিয়র কর্মচারীদের মেস ছিল বাড়ির একটা তলায়। তাদের খাওয়া দাওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদির দায়িত্ব ছিল বড় বউয়ের উপর। পরে থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি তাদের দেশি ভাষা শেখানোর প্রচেষ্টাও চলল বেশ কয়েক বছর। হিন্দি, ফারসী শেখানো হত। বত্রিশটা মত ছাত্র, তাদের পড়ার ঘর, পরীক্ষা দেওয়ার হলঘর, লাইব্রেরি...সব মিলিয়ে বাড়ি প্রায় হোস্টেলে পরিণত। তারপর কিছুদিন বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চলেছিল, ইস্ট ইন্ডিয়া রেল কোম্পানির অফিসও। PWD-র অফিসাররাও কিছু অফিস ঘর ভাড়া নিয়েছিল একটা সময়। এই সব কিছুর সাক্ষী বড় বউ।

এখন রাজ্যের কাজ। পুরো পরিবারটার সব রকম দায়িত্ব একার কাঁধে। শেষবারের মত আয়নায় চোখ বোলালেন তিনি। এ বাড়ির সব মেয়ে-বউদের থেকে লম্বা ছিলেন একটা সময়; সেই নিয়ে খানিকটা চাপা গর্বও ছিল তাঁর। এখনকার বাঙালি মেয়েগুলো কি লম্বা লম্বা! কি ছিপছিপে গড়ন তাদের! নিজের ভারী চেহারাটা দেখে খানিক কষ্টই হল বেচারির।
********
অ্যান্ড্রুকে ডাক দিলেন বড় বউ। বহু বছর আছে সে এই বাড়িতে। লম্বা, ছিপছিপে চেহারা; এখন বয়েসের ছাপে সাদা চামড়া মলিন হয়েছে খানিক। তবুও ঠাঁটেবাটে এখনও সাহেব। এই বাড়িতে প্রথম এয়ার-কন্ডিশন মেশিন বসে ওর ঘরে। ও সাহেববলেই বোধহয়! নিজের ঘরে বসে আপন মনে বাইবেলের তত্ত্বকথা পড়ে সে।

একটা অভিনব জিনিস আছে অ্যান্ড্রুর কাছে। গল্পে, সিনেমায় যেরকম ওয়েদার ককদেখায়, সেরকম একটা। ওটা ছাদে রেখেছে সে। হাওয়ার গতি বলে দেয় ছোট্ট মোরগটা। আর আছে একটা মহামূল্য বড় ডায়ালের একটা ঘড়ি।
********
বাকিদের একে একে ঘুম থেকে তোলার আগে বড় বউ একতলার গাড়ি বারান্দাটা দেখে নিলেন একবার। সারি সারি গাড়ির মেলা বসে সারা দিন জুড়ে। গাড়ি রাখার জায়গার ঠিক ওপরের ঘরটাতে আয়না। গাড়ির চাকার তাণ্ডবে কতবার যে আয়নাটা কেঁপে ওঠে; মায়া হয় বউয়ের। এই আয়নাটা বড় প্রিয় তাঁর। এই বাড়ির সব থেকে পুরনো বাসিন্দা। ৩০০ বছরের ওপর নাকি বয়েস। কিভাবে এই বাড়িতে এলো সেটা সঠিক জানে না বাড়ির কেউই। শোনা যায়, সাবর্ণ রায় চৌধুরীদের জিনিস নাকি! কোন পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। আবার এও কানে এসেছে যে লালচাঁদ বসাক নামক এক ভদ্রলোকের থেকে কেনা এটি। কেউ কেউ আবার মনে করে লাল মোহন শেঠ নামের এক ব্যবসায়ীর ছিল এই আয়নাটা।  
*******
উঠে পড় খোকা। ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে দিলেন বড় বউ। ছেলে মস্ত বড় ব্যাঙ্কে কাজ করে। প্রচুর টাকার লেনদেন সামলায় সে। অঙ্কে দারুণ মাথা ছিল ছেলেটার; বুদ্ধিও তীক্ষ্ণ। শুধু চেহারাটা এবাড়ির মত পায়নি। কাকের বাসায় কোকিল ছানাকথাটার ঠিক উল্টো নিদর্শন! মায়ের দৌলতে লম্বা হয়েছে একগাদা; কিন্তু দেখতে...এই নিয়ে কি কম কথা শুনেছে পাঁচজনের কাছে? আহা রে!

*********
বড় ছেলের পাশের ঘরে থাকেন বড় বউয়ের দূর সম্পর্কের এক বোন। বয়েসে অনেকটাই ছোট, কিন্তু চেহারায় দুই বোনের ভীষণ মিল। এই বোনের বিয়ে হয়েছিল এক জমিদারের সঙ্গে। তখন জমিদারদের কালেক্টরও বলা হত। র‍্যালফ শেলডন নাম ছিল তাঁর। এক বিদেশি কোম্পানির প্রথম কালেক্টর তিনি। নন্দরাম, জগৎ দাস, রাম ভদ্র আর গোবিন্দরাম মিত্র ...এই চার ভদ্রলোককে নিয়ে শেলডন সাহেব তিন তিনটে গ্রাম সামলাতেন। সেই সময় শুধু খাজনা আদায় না, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, রাস্তা তৈরি, ড্রেন পরিষ্কার রাখা এবং সর্বোপরি প্রজাদের ভালো-থাকার দায়িত্ব সবটাই ছিল জমিদারের ওপর। স্বামীর কল্যাণে বহুবার বাড়ি বদল হয়েছে এঁদের। এক সময় পার্ক স্ট্রীট-চৌরঙ্গীর ক্রসিংয়েও একটা বাড়িতে থেকেছেন কিছুদিন। তারপর চার্চ লেনের একটা বাড়িতে। সেই বাড়ি থেকেই তৈরি হয়েছিল প্রথম টাকা। ১৭৫৭ এর অগাস্ট মাস...একি আজকের কথা?

স্বামীর মৃত্যুর পর কাজের রকমফের হয়েছে কিছু। কাজ এখন অনেকটাই হালকা। দিনের প্রথমার্ধে কাজকর্ম গুটিয়ে, দুই বোন সিলিঙ-অবধি লম্বা বইয়ের তাক থেকে পুরনো বই নামিয়ে পড়েন। পুরনো কলকাতা গেজেটের বাঁধানো বইগুলো উল্টে পাল্টে দেখতে মন্দ লাগেনা!

*******
আর একজন বয়স্কা আত্মীয়ার ঘর ঠিক তার পরেই। সাদা তুলোর মত ধপধপে গায়ের রঙ। সাদা এক ঢাল চুলের বড় গোল খোঁপা মাথার ওপর। গায়ের রঙের কিন্তু একটা গল্প আছে। বুড়িমা’-র  বাবা ছিলেন সাহেব। ওয়াল্টার গ্রানভিল। সাহেবের অন্য দুই সন্তানও চোখ জুড়নো সুন্দর। বড়জন ২০০ বছরে পা দিলেন এই বছর। মহামূল্য বহু জিনিস সংগ্রহ করার শখ তাঁর। বাড়ি চৌরঙ্গী। অন্য সন্তানটিকে আইনের পীঠস্থান বলা হয়। থাকেন ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রীটের কোণার বাড়িটায়। তাঁর কল্যাণে আমাদের মত অধমেরা করে খাচ্ছি

বুড়িমার কাছে একটা অদ্ভুত তিন-মুখো বিদেশি ঘড়ি আছে। তাঁর ঢং ঢং শব্দেই ঘুম ভাঙ্গে বাড়ির বেশির ভাগ সদস্যের। এই ঘড়ির বেলটা লন্ডনের বিগ বেন কোম্পানির তৈরি! ১৮৯৭ সালে। তখনকার দিনে সাত হাজার টাকায় কেনা! ঘড়ির একটা বিরল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তিন দিকে তিনটে সময় দেখাতো... ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম, গ্রিনিচ মিন টাইম আর ক্যালকাটা টাইম। এখন সেই বহুমুখিতা নেই ঘড়ির। দম দিতে হয় একদিন অন্তর; নইলে কলকব্জা শিথিল হয়ে পড়ে। পতিত পাবন দত্ত নামক এক ভদ্রলোককে রেখেছেন এঁরা। তিনি আর তাঁর ছেলেরাই ঘড়ির পথচলার সঙ্গী।

দুর্মূল্য জিনিস সংগ্রহ করাটা বোন পেয়েছেন বড়দার থেকে। বহু পুরনো ডাক টিকিট আর বহু পুরনো টেলিফোনের মডেল সযত্নে রাখা তাঁর কাছে। সেই সঙ্গে পুরনো চিঠি। অলস দুপুরগুলো পৃথিবীর নানা কোণায় ছড়িয়ে থাকা আত্মীয় স্বজনের চিঠি পড়েই কাটে বুড়ির। ই-মেল করতে বা পড়তে পারেন না বলে কিছু মানুষের কাছে হাতে লেখা চিঠিতেই হাতে স্বর্গ পাওয়া!

*********
বুড়ির পাশের ঘরটা যাঁর তিনি কাজ করেন ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে। ব্রিটিশ যুগের সাবেকিয়ানা অনেকটাই বজায় রেখেছেন ভদ্রলোক। কালো গোল ডায়েলের টেলিফোন, পুরনো দামি কাঠের আসবাব, অমূল্য বইয়ের অবারিত সম্ভার, সব মিলিয়ে তাঁর সারা গায়ে আভিজাত্যের গন্ধ।

********
বড় বউ এক ফাঁকে ডেকে দিলেন তাঁর মেয়েকে। মেয়েটার কপালটাও দাদার মত। মায়ের মত লম্বা হয়েছ ঠিকই। কিন্তু আর কোন শ্রী নেই চেহারায়। আর কি ভীষণ ধিঙ্গি! সারাদিন টেলিফোন আর টেলিফোন! এত কিসের কথা! কার সাথেই বা কথা? “এই মেয়ের বিয়ে দিতে এক জঙ্গল কাঠ আর একশোটা খড়ের গাদা পোড়াতে হবে আমায়”, দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বড় বউ।

*********
বড় বারান্দার কোণের ঘরটা যে মহিলার, তাঁর পিঠে বয়েসের ভার। নানা অসুখও দানা বেঁধেছে শরীরের আনাচে কানাচে। কিন্তু বাইরেটা যতটা সম্ভব পরিপাটি করে রেখেছেন। এই বয়েসেও ঘি রঙা লাল পাড় গরদের মোড়কে তিনি অনন্যা। ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো” ... এই শব্দগুলো যেন ওনার জন্য লেখা। যে সব চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করে না কেউ, পোস্টম্যান এসে সেগুলো দিয়ে যায় ওঁকে। উনি সেই অনাথ চিঠিগুলোকে ঠাঁই দেন নিজের আলমারিতে। অগুনতি সন্তান নিয়ে ভরা সংসার, শরীরের জরা-যন্ত্রণা ভুলে আবির-মাখা হাসি চোখে মুখে।

শান-বাঁধানো ফুটপাথে, পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।

ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত...
*******
বাড়ির যে মানুষটা সব থেকে কষ্টে আছেন, তাঁর কথা বলি। দুরারোগ্য ব্যাধি। ডাক্তাররা প্রায় জবাব দিয়েছিলেন। অথচ কম বয়েসে কি ডাকসাইটে লোক ছিলেন ইনিই। রূপে গুনে একাকার। আর সেই সঙ্গে বিশাল প্রতিপত্তি। আলাদা আলাদা দেরাজে রাখা থাকত নোট আর সোনার কয়েন। রুপোর পয়সায় ঠাসা ছিল একটা বড় আলমারি। তখন পাড়ার লোকে পুরনো, নোংরা, ছেঁড়া টাকা বদল করতে আসতো এঁরই কাছে। শরীর ভাঙতে শুরু করলে, দাদু তাঁর নাতিকে সব বুঝিয়ে দেন। বড় বউয়ের ছেলেই সেই নাতি। ব্যাঙ্কের সবরকম কাজ এই দাদুর থেকেই শেখা। ওনার কর্মজীবনও যে শুরু হয়েছিল আগ্রা অ্যান্ড মাষ্টারম্যান্স ব্যাঙ্কে চাকরি সূত্রে।


এখন শুধু স্যালাইন আর ওষুধের নল সারা শরীরে। বাঁচানোর শেষ প্রচেষ্টা। দেখা যাক...

*********************************************

ভুতুড়ে বাড়িটার দিকে কি তাকিয়ে আছেন? লাইন যে এগিয়ে গেল!

ওমা, হ্যাঁ, তাই তো! দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে গেলাম বেহালা-বিবিডি-বাগ বাসের দিকে। অন্তত বাসচালকের পেছনের কাঠের সিটটা পেলেও উঠে পড়ব।

সাত বছর আগের কথা। ফক্স অ্যান্ড মণ্ডলে সবে ঢুকেছি ট্রেনী হিসেবে। প্রথম দুমাস কোন stipend পাইনি। তখন শ্বশুরমশাই হাত খরচ দিতেন হাজার টাকা। বরও ওই টাকাই। দুহাজারে বাস ছাড়া অন্য কিছু নেওয়া যেত না। (তারপরও মাসের শেষে টাকা জমত আমার!) রোজ কালো জেলি-লজেন্স কিনতাম ফেরার পথে। তিন টাকায় ছটা। মাঝে মাঝে আমলকী (পেস্তা রঙের, শুকনোগুলো না)। আর একবার ভীষণ শখ করে দশ টাকা দিয়ে সুখী গৃহিণীর টিপস্। সেই বইয়ের বিশেষ কোনও টিপস্ আজ আমার মনে নেই, একটা ছাড়া। একটা কাঁচের গ্লাসের মধ্যে যদি আর একটা কাঁচের গ্লাস আটকে যায়, তবে তলারটা গরম জলে ডোবান, আর ওপরেরটায় ঠাণ্ডা জল ঢালুন। গ্লাস দুটি একে অপরকে ছেড়ে দেবে।

(ছেড়ে দেওয়া সত্যিই যদি এতটা সোজা হতো...)

*********
এটা শেষ সপ্তাহ আমার এই অফিসে। যে কোন দুটো কাঁচের গ্লাস যখন আলাদা হয়, কিছু সুন্দর স্মৃতি নিয়েই আলাদা হয়। আমার এইটা! প্রথম আড়াইটা বছর রোজ অফিস থেকে বাড়ি ফেরা, ইস্টবেঙ্গলের জার্সি পরা মেরুন-হলুদ মিনি বাসে। লাল দিঘির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হাঁ করে দেখতাম চারিদিকের বাড়িগুলোকে। রাইটার্সসেন্ট অ্যান্ড্রু’স চার্চ, RBI, ক্যালকাটা কালেক্টরেট, GPO, রয়্যাল ইনসিওরেন্স বিল্ডিং, টেলিফোন ভবন, ডেড লেটারস অফিস, কারেন্সি বিল্ডিং... ... রোজ নতুন করে অবাক হতাম। : )

কলকাতা যে কতটা সুন্দর তা জানতেই পারতাম না, এই পাড়ায় অফিস না হলে...

*******
তখন অনেক রাত তখন অনেক তারা মনুমেন্ট মিনারের মাথা
নির্জনে ঘিরেছে এসে; মনে হয় কোনদিন এর চেয়ে সহজ সম্ভব
আর কিছু দেখেছি কি; একরাশ তারা-আর-মনুমেন্ট-ভরা        
                                                                                                কলকাতা?...”

ঠিক ১০০ বছর আগের ছবি। ১৯১৪। আজও একই রকম সুন্দর...(ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)

 ছোটবেলায় বাড়িতে কোল্ড ড্রিংকের বোতল শেষ হয়ে গেলে, ভালো করে ধুতে দিতাম না আমি। জল খেতাম ওই বোতলে, যাতে শেষ হওয়ার পরেও স্বাদ আর গন্ধটা লেগে থাকে...

আর রাখতাম পুরনো খাতার ভেতর গোলাপ ফুল...গন্ধ চলে গেলেও স্মৃতিটুকু তো থাকবে!

******************